আইনজীবী হয়েই দুদকের মামলায় বাবাকে খালাস করলেন ছেলে - Vikaspedia

আইনজীবী হয়েই দুদকের মামলায় বাবাকে খালাস করলেন ছেলে

সব মা-বাবাই চান বড় হয়ে সন্তান তাদের গর্বের কারণ হোক। সেই স্বপ্নের পথেই চালিত করেন সন্তানদের। চট্টগ্রামের স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা শেখ সরওয়ার্দীও চেয়েছিলেন ছেলে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করুক। বড় আইনজীবী হোক। বাবার সে স্বপ্ন পূরণ করেছেন ছেলে শেখ সরফুদ্দিন সৌরভ। এমনকি আইনজীবী হয়ে বাবার জামিন ও মামলা থেকে অব্যাহতির জন্য দাঁড়িয়েছেন আদালতে। এ দৃশ্যে গর্বিত বাবা শেখ সরওয়ার্দী।

২০ বছর আগে দুদকের করা এক মামলায় বাবার পক্ষে একবার জামিন বহাল রাখতে, আরেকবার মামলার দায় থেকে অব্যাহতি নিতে আদালতে দাঁড়ালেন শেখ সরফুদ্দিন সৌরভ। আদালত দুবারই আইনজীবী ছেলের আবেদন মঞ্জুর করেছেন। বাবার জন্য ছেলের এ আইনি লড়াইয়ে মুগ্ধ অনেকেই। খুশি বাবাও। মঙ্গলবার (১ মার্চ) চট্টগ্রাম বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতে এমন দৃশ্যেরই অবতারণা হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আইনজীবী ছেলের নাম শেখ সরফুদ্দিন সৌরভ। বাবার নাম শেখ সরওয়ার্দী। তারা চট্টগ্রাম নগরের পাঁচলাইশ থানার মুরাদপুর পিলখানা রোড এলাকার বাসিন্দা। ২০১৪ সালে নগরের প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হন সরফুদ্দিন। ২০১৭ সালে পড়াশোনা শেষ করে তিনি চট্টগ্রাম আদালতে শিক্ষানবিশ আইনজীবী হিসেবে কাজ শুরু করেন। সবশেষ আইনজীবী তালিকাভুক্তির পরীক্ষা শেষে ২০২১ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর তিনি চট্টগ্রাম বারে অন্তর্ভুক্ত হন।

শেখ সরওয়ার্দী নগরীর ৮ নম্বর শুলকবহর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। চট্টগ্রামের প্রয়াত মেয়র আলহাজ্ব এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর একনিষ্ঠ কর্মী ছিলেন তিনি। ছেলের এমন আইনি লড়াই নিয়ে তিনি কথা বলেন জাগো নিউজের সঙ্গে।

শেখ সরওয়ার্দী বলেন, আমি যখন মামলায় আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছি, তখন আমার ছেলে নাসিরাবাদ সরকারি স্কুলের ছাত্র। জীবিনেও চিন্তা করিনি আমার ছেলে আইনজীবী হয়ে আমাকে মুক্ত করবে। তবে তা-ই হয়েছে। আমার ছেলে আইনজীবী হওয়ার ক্ষেত্রে বেশি অবদান ছিল মহিউদ্দিন চৌধুরীর। তিনিই তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়েছেন। আমারও ইচ্ছা ছিল যেহেতু রাজনীতি করি, আইন পেশায় ছেলেকে পড়াতে পারলে ভালো হয়। এ চিন্তা থেকে ছেলেকে আইনি পেশায় পড়িয়েছি।

ওই সময়কার স্মৃতিচারণ করে আওয়ামী লীগের এ নেতা বলেন, রাজনীতি করে অনেক হারিয়েছি। জীবনে কিছু চাইনি। একসময় মহিউদ্দিন চৌধুরী আমার মতো কয়েকজন নেতাকর্মীর জন্য ভাসমান কিছু দোকান করে দিয়েছিলেন। এগুলো টিনের দোকান। নিচেও টিন, উপরেও টিন, পাশেও টিন। বিএনপি সরকারে এসেই ২০০২ সালে মামলা করেছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসে দোকান ভেঙে দিয়েছে। কিন্তু সে মামলার ঘানি টেনেছি প্রায় ২০ বছর। আজ (মঙ্গলবার) অব্যাহতি পেয়েছি। এটি আমার জন্য আনন্দের। তবে সবচেয়ে বেশি আনন্দের আমার ছেলের আইনি লড়াইয়ে আমি খালাস পেয়েছি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নবীন আইনজীবী শেখ সরফুদ্দিন সৌরভ জাগো নিউজকে বলেন, আজকের দিনটা আমার জন্য আনন্দের। আইনজীবী হয়ে বাবাকে মুক্ত করেছি। প্রথমবার বাবার জামিন বহাল রাখতে দাঁড়িয়েছিলাম। আজকে দ্বিতীয়বার মামলার দায় থেকে অব্যাহতির জন্য দাঁড়িয়েছি। দুবারই আদালত আবেদন মঞ্জুর করেছেন। অবশ্য আমার সঙ্গে আমার সিনিয়র আইনজীবীরাও ছিলেন।

আদালত সূত্র জানায়, ১৯৯৭ সালে নগরীর মুরাদপুর এলাকায় সিটি করপোরেশনের বাস টার্মিনালের যাত্রী ছাউনিতে ২৩টি দোকান বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি না দিয়ে মনগড়াভাবে এসব দোকানের বরাদ্দ দেওয়ার অভিযোগে ২০০২ সালের ১৩ অক্টোবর কোতোয়ালি থানায় মামলা দায়ের হয়। দুর্নীতি দমন ব্যুরোর চট্টগ্রামের পরিদর্শক সামসুল আলম বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। ওই মামলায় আসামি করা হয় প্রয়াত মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীসহ ২৪ জনকে।

মামলাটির তদন্ত শেষে ২০০৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি মহিউদ্দিন চৌধুরীসহ ২৪ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন দুদক চট্টগ্রামের তৎকালীন পরিদর্শক জাহাঙ্গীর আলম। পরে মহিউদ্দিন চৌধুরীর রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে উচ্চ আদালত ২০০৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি মামলাটির কার্যক্রমের ওপর স্থগিতাদেশ দেন।

২০১৯ সালের ১৬ জানুয়ারি মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য দুদককে নির্দেশ দেন আদালত। আদালতের আদেশে প্রধান কার্যালয়ের অনুমোদন সাপেক্ষে আরেকটি প্রতিবেদন জমা দেয় দুদক। এরপর মঙ্গলবার (১ মার্চ) আদালতে অভিযোগ গঠনের দিন ধার্য ছিল। এদিন আদালতে অভিযোগের দায় থেকে অব্যাহতির আবেদন করেন আসামিপক্ষের আইনজীবী।

অভিযোগ গঠনের দিনেই আসামিপক্ষের আইনজীবীদের করা আবেদনের প্রেক্ষিতে সব আসামিকে অব্যাহতি দেন আদালত। অব্যাহতি পাওয়া আমাসিদের মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের বর্তমান সভাপতি মাহতাব উদ্দিনের ছেলেসহ ২০ আসামি রয়েছেন।

অভিযোগপত্রে কেবিএম সিরাজ উদ্দিন, হাফেজ আহমদ ও খায়রুল আনোয়ার মৃত্যুবরণ করায় তাদের মামলার দায় থেকে অব্যাহতির আবেদন জানানো হয়। এর আগে এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী মারা যাওয়ায় ২০১৮ সালের ৩০ মে আদালত তাকেও অব্যাহতি দেন।

দুদকের আইনজীবী কাজী সানোয়ার আহমেদ লাভলু জাগো নিউজকে বলেন, বর্তমানে আসামিদের মধ্যে যারা জীবিত আছেন তারা সবাই টাকা দিয়ে দোকান কিনেছেন। এক্ষেত্রে সিটি করপোরেশন কোনো অনিয়ম করেছে কি না, সেটি তাদের বিষয় নয়। সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে আদালত আসামিদের অভিযোগের দায় থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন।