‘আম গাছের ডালে বসেও সতিত্ব রক্ষা করতে পারিনি’ - Vikaspedia

‘আম গাছের ডালে বসেও সতিত্ব রক্ষা করতে পারিনি’

আফিয়া বেগম একজন বীরাঙ্গনা। কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার ঢালুয়া ইউনিয়নের মোগরা গ্রামের আলতাব আলী ও নুরুন নাহারের দ্বিতীয় মেয়ে তিনি। পিতা-মাতার দুইছেলে ও চার মেয়ের মধ্যে আফিয়া দ্বিতীয়।
কুমিল্লার এই বীরঙ্গনা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাক হানাদার বাহিনীর নির্মম নির্যাতনের বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি বলেন,

আফিয়া বেগম বলেন, বাড়ির পাশে হাসানপুর রেলস্টেশন। এখানে ছিলো আর্মি ক্যাম্প। স্থানীয় রাজাকারদের মাধ্যমে পাক আর্মির মানুষরুপী পশুরা জেনে যায় আমার কথা। তখন আমার বয়স ১৭/১৮ হবে। বিয়ে হয়নি। ২/১ দিন পর পর আমাকে খুঁজতে তারা আমাদের বাড়িতে হানা দিত। যেহেতু বাড়ির কাছেই আর্মি ক্যাম্প তাই তারা আসছে এ খবর পেয়েই লুকিয়ে থাকতাম। ভয়ে সারা শরীর কেঁপে উঠতো। বাবা-মা ও আমি কত যে এক সাথে গলায় ধরে কেঁদেছি তার কোনো হিসাব নেই।

আমাদের ছোট ঘর। ঘরের ভিতর কার ছিল। যখনি শুনতাম পাক আর্মি আসছে দৌঁড় দিয়ে কারে উঠে যেতাম। তারা আমাকে সারা ঘর খুঁজে না পেয়ে বাবাকে মারধর করে চলে যেতো। অনেক দিন তাদের আগমণের কথা শুনলে ঘরের পেছনে একটি বড় আম গাছের ডালার পাতা দিয়ে নিজেকে লুকিয়ে রাখতাম।

একদিন আমরা সবাই সকালে নাস্তা খাব। এমন সময় খবর এল পাক আর্মি আমাদের বাড়ির প্রায় কাছাকাছি চলে এসেছে। দৌঁড় দিয়ে পুকুরে লাফ দিয়ে কচুরি পানার মধ্যে লুকিয়ে রইলাম। এ দিন আমাকে না পেয়ে বাবার সাথে মাকেও বেধরক মেরেছিল। এ বাড়ি ঐ বাড়ি গিয়েও অনেক লুকিয়ে ছিলাম। গরিব মানুষ, কোথাও যাওয়ার নেই। রাতে প্রায় ঘরের কারে ঘুমাতাম। কিন্ত এত কিছু করেও আমি আমার ইজ্জ্বত রক্ষা করতে পারিনি।

আমাকে যখন তারা কোন মতেই ধরতে পারছিল না তখন সোর্স হিসেবে নিয়োগ করল স্থানীয় এক রাজাকারকে। একদিন সকালে পুকুর পাড়ে থালা-বাসন পরিষ্কার করছি এমন সময় রাজাকারের মাধ্যমে খবর পেয়ে তারা আমাকে ধরে নিয়ে গেল হাসানপুর রেলস্টেশনের ক্যাম্পে। বাধা দেওয়ায় আমার সামনেই বাবা-মাকে প্রচন্ড মারল। হাসানপুর ক্যাম্পে নিয়েই চালাল নির্মম নির্যাতন-এ কথা বলেই অঝোর ধারায় কান্না শুরু করল

স্বাধীনতার দেড় বছর পর পার্শ্ববর্তী ইউনিয়নের বক্সগঞ্জের টুনু মিয়ার সাথে আমার বিয়ে হয়। টুনু মিয়া ঢাকায় তিব্বতে ভাল চাকরি করত। পাক বাহিনীর নির্যাতনের কথা জেনেও টুনু মিয়া বিয়ে করেছিল। কিন্তু বিয়ের পর আমার শ্বাশুড়ী, শ্বশুর, দেবর ও ননদরা কথায় কথায় খোটা দিত। অসতী বলে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বলত। প্রথম প্রথম স্বামী তাদের পক্ষ না নিলেও এক পর্যায়ে তাদের পক্ষ হয়ে সেও আমাকে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন শুরু করল। এর মধ্যে আমার দুটি মেয়ে হয়। বড় মেয়ের বয়স তিন বছর আর ছোট মেয়ের বয়স যখন ৩ মাস তখন আমাকে এক কাপড়ে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। এই যে স্বামী ও দুই মেয়েকে হারালাম আজো জানতে পারিনি তারা কোথায় আছে।

প্রায় ৮/১০ বছর পর বাবা আবার আমাকে বরিশালের একটি ছেলের সাথে আবার বিয়ে দেয়। দ্বিতীয় স্বামীর ঘরে একটি ছেলে হয়। তারপর একদিন সেই স্বামীও নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। বর্তমানে বেঁচে আছে না মরে গেছে তাও বলতে পারব না।

আফিয়া বেগমকে এলাকাবাসী চাঁদা তুলে স্থানীয় একজনের একটি খালি জায়গায় ঘর তুলে দিয়েছে। কিন্তু বৃষ্টি-বাদল এলে এই ঘরটি আর ঘর থাকে না। সমস্ত ঘর পানিতে সয়লাব হয়ে যায়। বর্তমানে জায়গার মালিক আফিয়া বেগমকে নোটিশ দিয়ে বলেছে, দ্রুত জায়গায় ছেড়ে দিতে নতুবা তাকে উচেছদ করা হবে। অসুস্থ ও বয়সের ভারে নূহ্য আফিয়া বেগম এ কথা বলে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন।

চলতি বছর কুমিল্লা জেলা প্রশাসন থেকে বীরাঙ্গনাদের কুমিল্লায় নিয়ে আপনাদের যে সম্মান জানাল এবং উপজেলার চরজামুরাইল মৌজার ১নং খতিয়ানের ৪৪ দাগের ০.০৮ শতক জায়গা দিল এ কথা স্মরণ করিয়ে দিলে বীরাঙ্গনা আফিয়া বেগম ক্ষোভের সাথে বললেন, বাবা, আমাকে যেখানে জায়গায় দিয়েছে, প্রথমেই বলতে পারি এটা কোন কাজে আসবে বলে মনে হয় না। আমাদের গ্রাম থেকে অনেক দূরে। বার মাসের মধ্যে এগার মাস থাকে পানি। তারপরেও ডিসি স্যারকে ধন্যবাদ জানাই।

আফিয়া বেগমের শেষ অনুরোধ, আমি আর বিশেষ কিছু চাই না। আমার জীবন তো প্রায় শেষ। যদি পারেন তাহলে একটু লিখে দিবেন, সরকারের বদান্যতায় জীবনের শেষ কটি দিন যেন মান সম্মান নিয়ে কাটাতে পারি।