ঊষর ইট-পাথরের শহরে ৪০ বছর ধরে সুর ছড়াচ্ছেন - Vikaspedia

ঊষর ইট-পাথরের শহরে ৪০ বছর ধরে সুর ছড়াচ্ছেন

ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি পেরিয়ে অগ্নিঝরা মার্চে প্রবেশ করলেও ‘অমর একুশে বই মেলা-২০২২’ থেকে একুশের আমেজ কমে নি। বই মেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ১ নং গেট দিয়ে বের হবার পথে দূর থেকে ভেসে আসছে ফজল-এ-খোদা’র লেখা ও আব্দুল জব্বারের সুর করা গানের সুরেলা সুর “সালাম সালাম হাজার সালাম, সকল শহীদ স্মরণে, আমার হৃদয় রেখে যেতে চাই, তাদের স্মৃতির চরণে।”

সুরের দিকে এগোতে দেখা মিলে ষাটোর্ধ্ব এক বৃদ্ধের! এক হাতে বাদ্যযন্ত্র অন্য হাতে বাদ্যযন্ত্রটি বাজানো আরেক যন্ত্র। কাঁধে ঝোলানো এক ব্যাগে অনেকগুলো বাদ্যযন্ত্র। নাম, মো. সালাউদ্দিন ; মেলায় আগত দর্শনার্থীরা মনোমুগ্ধ হয়ে তাঁর যন্ত্রের বাজনা শুনছেন। যন্ত্রের নাম দিয়েছেন ‘বাংলা বেহালা’। সুর ছড়ানোর পাশাপশি বিক্রি করছেন ওই বাদ্যযন্ত্রটি। দশ বছর থেকে এ বেহালা বাজান সালাউদ্দিন।

মিরপুরের ১ -র বাসিন্দা সালাউদ্দিন, শৈশবের দীর্ঘপথ যাঁর কেটেছে রাজধানীর চানখাঁরপুল। তিনি জানান, মাটি ও বাঁশ দিয়ে তৈরি এক তারের বেহালার সঙ্গে মিশে আসে তাঁর পারিবারিক বংশ ধারা। ৪০ বছর ধরে ঢাকার রাস্তায় রাস্তায় বেহালা বাজিয়ে সুর ছড়িয়ে যাচ্ছেন তিনি। সুর বিক্রি না করলে বিক্রি করছেন বাদ্যযন্ত্রটি।

বাংলা বেহালা বাজনা শিখতে চাইলে অনেক অধ্যবসায়, শ্রম ও সাধনার প্রয়োজন। তাইলেই এক তারে বেজে উঠবে সু-মধুর সুর, বলে মনে করেন সালাউদ্দিন। সালাউদ্দিনের বেহালার মূল কাঠামো বাঁশের। তার এক প্রান্তে মাটির ছোট পাত্রের ওপর পাতলা চামড়ার আবরণ। বাঁশের ছড়ে যুক্ত প্লাস্টিকের সুতা। প্রতিটি বেহালা তিনি বিক্রি করেন ১০০ টাকায়।

তিনি আরো জানান, ব্রিটিশ আমলে তাঁর দাদা বাচ্চু মিয়া আসাম থেকে ঢাকায় আসেন। যিনিও ছিলেন এমন মাটির বেহালার বাদক। তারপর সালাউদ্দিনের বাবা মনু মিয়ার হাত ধরে এই বেহালা বাজানো শেখেন সালাউদ্দিন। চার ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি (সালাউদ্দিন) ও তাঁর আরেক ভাই বেহালা পেশায় আসেন। বেহালা বানানোও শেখেন বাবা মনু মিয়ার হাত ধরে।

বাংলা বেহালা ও তাঁর বাবা মনু মিয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার বাবা দেশ-বিদেশে বিভিন্ন জায়গাতে অনুষ্ঠানও করেছেন। এমনকি আমেরিকা পর্যন্তও গিয়েছেন, অনুষ্ঠান করেছেন কিন্ত উপার্জনের টাকা থেকে বাবাকে বঞ্চিত করেছে কতিপয় লোক।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর বাবা মনু মিয়ার বাজনা পছন্দ করতেন, বলে দাবি করেন এ বেহালা বাদক। তখন তাঁরা থাকতেন চানখাঁরপুল এলাকায়। এমনকি বঙ্গবন্ধু তনয় শেখ কামালও কিছুদিন মনু মিয়ার কাছে এই বেহালা বাজানো শিখেছিলেন।

১৯৭১ সাল, দেশে যখন বিশৃঙ্খলা তখন না’কি মনু মিয়ার বাদ্যযন্ত্রটি বন্দুক ভেবে পাকিস্তানি সেনারা তাঁকে আটক করে বসে। যখন সেনারা জানতে পারে এটি মাটির বেহালা, তখন তাঁকে ছেড়ে দেয়। সেনারা না’কি তাঁর বাবার বাজানো সুরের প্রেমে পড়ে যান। পাকিস্তানি আর্মিরা প্রায়ই বিভিন্ন গানের সুর শুনতে আসতেন, কখনো বা ওদের গাড়িতে করে মনু মিয়াকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরত সেনাবাহিনীরা। শুধু সুরের জন্য! সালাউদ্দিনের দাবি, হয়তো এ বেহালার কারণে আমরা ওই যাত্রায় বেঁচে গেছি। নাহলে হয়তো পাকিস্তানিরা আমাদের মেরে ফেলত।

সালাউদ্দিনও তাঁর বাবার মতই খ্যাতনামা সংগীত শিল্পীদের সঙ্গে কাজ করেছেন। আব্দুল জব্বার, মুজিব পরদেশী, মরমী শিল্পী ইব্রাহিম, দিলরুবা খানের মত খ্যাত নামা সংগীত শিল্পীদের সাথে অনুষ্ঠান করেছেন সালাউদ্দিন। বিখ্যাত সুরকার ও গায়ক আব্দুল জব্বার না’কি তাঁর কাঁধে হাত রেখে বলেছিলেন, “তোমার বাবা সুন্দর সুর তুলতেন, তুমিও একদিন অনেক সুন্দর বাজাবে। আমার বিশ্বাস।”

আব্দুল জব্বারের সেই বিশ্বাস ধরে রাখলেও সালাউদ্দিন তাঁর সন্তানদের হাতে তুলে দেন নি ‘এ বাংলা বেহালা।’ বাংলা বেহালার ঐতিহ্য হয়তো তিনি ও তাঁর ভাইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে যাবে, তাঁদের গত হওয়ার মধ্য দিয়ে ‘বাংলা বেহালা’ ও গত হয়ে যাবে দেশের সংস্কৃতি থেকে।

সন্তানদের বেহালার বদলে তুলে দিয়েছেন খাতা-কলম। মো. সালাউদ্দিন আক্ষেপ করে বলেন, “এদেশে শিল্পীর কোন দাম নেই! এদেশে শিল্পী হওয়া আরেকটা কলঙ্কিনী হওয়া সমান কথা! এদেশে শিল্পীর কোন মূল্য নেই।” সন্তানদের এমন অনিশ্চিতের মধ্যে ঠেলে দিতে চান না তিনি।

“আমাদের দুঃখের গল্পটি এমনই থাকবে, গল্পটি কোনদিন সুখের হবে না।” তবুও যেন এ ‘বাংলা বেহালা’ কালের গর্ভে হারিয়ে না যায় সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ জানান তিনি।

স্বাধীনতা প্রথমের দিকে শান্তি থাকলেও, স্বাধীনতা পর শুধু অশান্তি আর অশান্তির মধ্যে কাটাতে হয়েছে এ শিল্পীকে। অভাব অনটনের মধ্য দিয়ে খেয়ে না খেয়ে থাকতে হয়েছে ‘বেহালা’ কে সঙ্গে নিয়ে। যত দিন বেঁচে থাকবেন, ততদিন এ অশান্তির মধ্য থেকেই আক্ষেপের সু-মধুর সুর মানুষের মাঝে বিলিয়ে দেবেন, বলে জানান সালাউদ্দিন।