পানিসংকট রোধে ইসলামের নির্দেশনা - Vikaspedia

পানিসংকট রোধে ইসলামের নির্দেশনা

পানি মহান আল্লাহর অমূল্য নিয়ামত। পানির গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে বলা হয় পানির অপর নাম জীবন। পবিত্র কোরআনে এ উক্তিটির সপক্ষে প্রমাণ রয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘অবিশ্বাসীরা কি দেখে না যে আকাশ আর জমিন একসঙ্গে সংযুক্ত ছিল, অতঃপর আমি উভয়কে আলাদা করে দিলাম, আর প্রাণসম্পন্ন সব কিছু পানি থেকে সৃষ্টি করলাম।

তবু কি তারা ঈমান আনবে না?’ (সুরা : আম্বিয়া, আয়াত : ৩০)
অর্থাৎ প্রত্যেক প্রাণী সৃজনে পানির অবশ্যই প্রভাব আছে। এসব বস্তু সৃজন, আবিষ্কার ও ক্রমবিকাশে পানির প্রভাব অপরিসীম। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, আমি রাসুল (সা.)-এর কাছে আরজ করলাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমি যখন আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করি, তখন আমার অন্তর প্রফুল্ল এবং চক্ষু শীতল হয়। আপনি আমাকে প্রত্যেক বস্তু সৃজন সম্পর্কে তথ্য বলে দিন। জওয়াবে তিনি বলেন, ‘প্রত্যেক বস্তু পানি থেকে সৃজিত হয়েছে। ’ (মুসনাদে আহমাদ : ২/২৯৫)

অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর যিনি আসমান থেকে পরিমিতভাবে পানি বর্ষণ করেন। অতঃপর আমি তা দ্বারা মৃত জনপদকে সঞ্জীবিত করি। এভাবেই তোমাদের বের করা হবে। ’ (সুরা : যুখরুফ, আয়াত : ১১)

অর্থাৎ পৃথিবীর সমস্ত প্রাণীর জীবন-জীবিকার সঙ্গে পানির সম্পর্ক খুব দৃঢ়। তাই পানির মতো অমূল্য নিয়ামতের যথাযথ মূল্যায়ন করা এবং শুকরিয়া করা আমাদের সবার দায়িত্ব। তা না হলে গোটা পৃথিবীর মানুষকে বড় বিপদে পড়তে হতে পারে।

জাতিসংঘের চলতি বছরের পানি উন্নয়ন প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে, ২০৫০ সালের মধ্যে ৫০০ কোটির বেশি মানুষ পানি পেতে অসুবিধায় পড়তে পারে। এর আগে ২০১৮ সালে ৩৬০ কোটি মানুষ বছরে অন্তত এক মাস পানি পেতে অসুবিধায় পড়ার কথা জানা গিয়েছিল।

বিশেষজ্ঞ অনাগত এই কঠিন পরিস্থিতির জন্য জনসংখ্যা বৃদ্ধি, খরা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনাকে দায়ী করলেও হাদিস শরিফে এর আধ্যাত্মিক একটি কারণ উল্লেখ আছে। উম্মতের কোন অপরাধের কারণে তাদের মধ্যে অনাবৃষ্টি, খরা ও পানির সংকট দেখা দেবে, সে বিষয়ে আগেই অবহিত করেছেন মহানবী (সা.)।

আবদুল্লাহ বিন উমার (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের দিকে এগিয়ে এসে বলেন, হে মুহাজিরগণ, তোমরা পাঁচটি বিষয়ে পরীক্ষার সম্মুখীন হবে। তবে আমি আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি, যেন তোমরা তার সম্মুখীন না হও। যখন কোনো জাতির মধ্যে প্রকাশ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ে তখন সেখানে মহামারি আকারে প্লেগরোগের প্রাদুর্ভাব হয়। তা ছাড়া এমন সব ব্যাধির উদ্ভব হয়, যা পূর্বেকার লোকদের মধ্যে কখনো দেখা যায়নি। যখন কোনো জাতি ওজন ও পরিমাপে কারচুপি করে তখন তাদের ওপর নেমে আসে দুর্ভিক্ষ, কঠিন বিপদ-মুসিবত এবং জাকাত আদায় করে না তখন আসমান থেকে বৃষ্টিবর্ষণ বন্ধ করে দেওয়া হয়। যদি ভূপৃষ্ঠে চতুষ্পদ জন্তু ও নির্বাক প্রাণী না থাকত, তাহলে আর কখনো বৃষ্টিপাত হতো না। যখন কোনো জাতি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের অঙ্গীকার ভঙ্গ করে, তখন আল্লাহ তাদের ওপর তাদের বিজাতীয় দুশমনকে ক্ষমতাসীন করেন এবং সে তাদের সহায়-সম্পদ সব কিছু কেড়ে নেয়। যখন তোমাদের শাসকবর্গ আল্লাহর কিতাব মোতাবেক মীমাংসা করে না এবং আল্লাহর নাজিলকৃত বিধানকে গ্রহণ করে না, তখন আল্লাহ তাদের পরস্পরের মধ্যে যুদ্ধ বাধিয়ে দেন। ’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৪০১৯)

উল্লিখিত হাদিসে জাকাত প্রদানে অবহেলাকে অনাবৃষ্টি ও পানি সংকটের কারণ বলে অবিহিত করেছেন নবীজি (সা.)। এ ছাড়া পানির মতো নিয়ামতের অবমূল্যায়ন তো আছেই। মানুষ যখন নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করে না, অপচয় করে, তখন তাদের থেকে নিয়ামত ছিনিয়ে নেওয়া হয়। পানির ক্ষেত্রেও হয়তো তাই হতে চলেছে। যদি ওপরে উল্লিখিত হাদিসের ভাষ্যমতে চতুষ্পদ জন্তু ও নির্বাক প্রাণীর অসিলায় আল্লাহ আমাদের জন্য পুরোপুরি বৃষ্টি ও পানির উৎস বন্ধ করে দেননি। তবে সংকট যে তৈরি হচ্ছে, তা দৃশ্যমান।

জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডাব্লিউএমও) গত বছরের অক্টোবরে এক রিপোর্টে এ তথ্য জানিয়েছিল।

বিশ্ব পানি উন্নয়ন প্রতিবেদন ২০২২-এ আরো বলা হয়েছে, বর্তমানে বিশ্বের ৯৯ শতাংশ সুপেয় পানির উৎস হলো ভূগর্ভস্থ। সেই পানির অবমূল্যায়ন, অব্যবস্থাপনা এবং অপব্যবহারের কারণে এটি ক্ষতির মুখে পড়ছে।

তাই আমাদের দায়িত্ব হলো, পানির অপব্যবহার রোধ করা, পানির অপচয়ের ব্যাপারে সতর্ক হওয়া। কারণ মহান আল্লাহ অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে আদাম সন্তান, প্রত্যেক নামাজের সময় তোমরা উত্তম পোশাক গ্রহণ করো, আর খাও, পান করো; কিন্তু অপচয় কোরো না, অবশ্যই তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না। ’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ৩১)

মহানবী (সা.) অপচয়ের ব্যাপারে যথেষ্ট কঠোর ছিলেন। তিনি তাঁর জীবদ্দশায় সাহাবায়ে কেরামকে পানির অপচয়ের বিষয়ে সতর্ক করেছেন। এমনকি প্রবাহিত নদীর পারে থাকলেও পানির অপচয় থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন।

আবদুল্লাহ বিন আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) সাদ (রা.)-কে অতিক্রম করে যাচ্ছিলেন, তখন তিনি অজুু করছিলেন। তিনি বলেন, এই অপচয় কেন? সাদ (রা.) বলেন, অজুতেও কি অপচয় আছে? তিনি বলেন, হ্যাঁ, যদিও তুমি প্রবহমান নদীতে থাকো। ’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৪২৫)

প্রিয় পাঠক, একবার ভাবুন তো, পানির অপচয় রোধ করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ হলে মহানবী (সা.) সাহাবায়ে কেরামকে অজুর ক্ষেত্রেও এর ব্যাপারে সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। অথচ অজু এমন একটি ইবাদত, যা ছাড়া নামাজ পড়া যায় না, আল্লাহর কোরআন স্পর্শ করা যায় না। অজুর মাধ্যমে বান্দার গুনাহগুলো ঝরে যায়। তার পরও মহানবী (সা.) অজু করার ক্ষেত্রেও পানির অপচয় যাতে না হয়ে যায়, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। অথচ আমরা খাওয়াদাওয়ার সময় কত পানি অপচয় করে ফেলি, আধুনিক ওয়াশরুমে কিংবা বেসিনে হাত-মুখ ধোয়ার সময়ও প্রচুর পরিমাণ পানি অযথাই নষ্ট হয়ে যায়, গোসলের সময় আমাদের দেশের মানুষের যে পরিমাণ পানি অপচয় হয়, পানি সংকটময় এলাকাগুলোতে হয়তো সে পরিমাণ পানি একটি মানুষের সারা দিনেও ব্যবহার করা হয় না।

যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু ব্যবহারে ইসলামের কোনো বিধিনিষেধ নেই; কিন্তু প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্যবহার ও অপচয়ের ক্ষেত্রে অবশ্যই ইসলামের আপত্তি রয়েছে। আবদুল্লাহ বিন আমর ইবনুল আস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা পানাহার করো, দান-খয়রাত করো এবং পরিধান করো যতক্ষণ না তার সঙ্গে অপচয় বা অহংকার যুক্ত হয়। ’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৩৬০৫)

তাই আমাদের উচিত, পানির অপচয় থেকে বিরত থাকা, মহান আল্লাহর এই নিয়ামতের যথাযথ মূল্যায়ন করা, আল্লাহর প্রদত্ত প্রকৃতিকে অহেতুক ধ্বংসের মুখে না ফেলা, পরিবেশ রক্ষায় সচেতন থাকা, কখনো কখনো অতিরিক্ত খরা ও পানিশূন্যতা অনুভব করলে আল্লাহর কাছে তাওবা করা এবং আল্লাহর সাহায্য চাওয়া। কারণ পানিসহ গোটা বিশ্বভ্রহ্মাণ্ডের মালিক আল্লাহ, তিনি চাইলে এক মুহূর্তে মরুর বুকে মহাসাগর তৈরি করে দিতে পারেন।