পেটে সন্তান জেনেও নিষ্ঠুর হৃদয় গলেনি - Vikaspedia

পেটে সন্তান জেনেও নিষ্ঠুর হৃদয় গলেনি

প্রথম স্বামী এবং প্রথম সন্তান হারানোর বেদনা আজো ভুলতে পারেননি বীরাঙ্গনা হাজেরা বেগম। পাক বাহিনী যখন তার উপর পৈশাচিক নির্যাতন চালায় তখন তিনি ছিলেন পাঁচমাসের অন্ত:সত্ত্বা। পেটে সন্তান আছে এ কথা জানিয়েও তাদের নিষ্ঠুর হৃদয়কে এতটুকু গলাতে পারেননি হাজেরা বেগম।

পরিণামে তার জীবনে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার। স্বামী আর তাকে ফিরিয়ে নেয়নি সংসারে। মারা যায় পেটের সন্তানটুকুও। পরবর্তী পর্যায়ে চাচাতো ভাইয়ের সাথে দ্বিতীয় বিয়ে হলেও সেই অব্যক্ত বেদনা ভুলতে পারেননি আজো। প্রতিনিয়ত তাকে সেই বিষয়টি তাড়া করে ফেরে। একাত্তর তার জীবনকে তছনছ করে দিয়েছে। দিয়েছে ‘নস্ট মেয়ে’র অমোছনীয় তকমা।

ক্ষোভের সাথে হাজেরা বেগম বলেন, যারা প্রকাশ্য যুদ্ধ করেছে তাদের চেয়ে কোন অংশই আমাদের অবদান কম নয়। আমরা সর্বস্ব হারিয়ে নামাজের বিছানায় ৯ মাস কেঁদে কেঁদে মহান আল্লাহকে বলেছি আল্লাহ এই পাক বাহিনীদের তুমি নিপাত করো ধ্বংস করো, তাদের অত্যাচারের বিচার করো।

বলছিলাম হাজেরা বেগমের কথা। কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার ময়নামতি ইউনিয়নের হরিণধরা গ্রামের মৃত দিলু মিয়া ও দুধ নেছার ২ ছেলে ও ৫ মেয়ের মধ্যে হাজেরা বেগম চতুর্থ। ১৯৭০ সালে যখন সারাদেশে নির্বাচনী আমেজ তৈরি হয় ঠিক তখনি ১৩-১৪ বছরের কিশোরী হাজেরা বেগমের বিয়ে হয় একই জেলার চান্দিনা উপজেলার শ্রীমন্তপুর গ্রামের মামাত ভাই আবদুর রহিমের সাথে।

৫ মাসের অন্ত:সত্ত্বা হাজেরা বেগম প্রথম সন্তান প্রসবের বাকি সময়টা বাপের বাড়িতে কাটানোর জন্য চলে আসেন বুড়িচংয়ের হরিণধরা গ্রামে। ১৯৭১ সালের এপ্রিল/মে মাসের কোনো এক দিন সকাল ৯টা কি ১০টা হবে। নাস্তা খেয়ে বাড়ির উঠানে আনমনা ভাবে হাঁটাহাঁটি করছেন হাজেরা। এমন সময় এক দল পাক আর্মি তাদের বাড়ির সামনে দিয়ে যাচ্ছে। তাদের দেখেই ভয়ে কেঁপে উঠে হাজেরা বেগমের দেহ-মন। কিছু বুঝে উঠার আগেই দেখতে পান ২/৩ জন পাক আর্মি তাকে ধরে টানা হেঁচড়া করছে। অন্যরা তার দিকে অশোভন হাসি হাসছে। মুহূর্তেই আশপাশের বাড়িঘর খালি হয়ে যায়। যে যেভাবে সম্ভব পালাচ্ছে। গাড়িতে করে তাকে দেবপুরের দিকে নিয়ে একটি ঘরে আটকে রাখে। এর পর চলে পাশবিক নির্মম নিপীড়ন।

তিনি বলেন, আমার পেটে ৫ মাসের বাচ্চা আছে এ কথা বলে, বাবা বাবা বলে তাদের কাছে কতবার যে বলেছি বাবারে আমাকে নষ্ট করবেন না। কিন্ত তারা আমার কান্না শুনেনি। বরং নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে। রাতে যখন ছেড়ে দেয় তখন আর বাড়িতে আসিনি। দুই দিন দেবপুরেই ছিলাম। তিন দিন পর বাড়ি আসি। মা-বাবা আমাকে গ্রহণ করলেও ফিরে পাইনি স্বামীর সংসার।

পেটের সন্তানটিও মারা যায়। স্বামী পরিষ্কার বলে দিয়েছে আমাকে আর তিনি গ্রহণ করবেন না। কি অপরাধে প্রথম স্বামী ও প্রথম সন্তান হারালাম, কি দোষ ছিল আমার, এই বৃদ্ধ বয়সে এসেও জানতে পারিনি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই বেদনা আমাকে বয়ে বেড়াতে হবে।

স্বামী ত্যাগ করে চলে যাওয়ার পর বাবা আমাকে আবার বিয়ে দেবার অনেক চেষ্টা করেছেন। কিন্তু ৭১’র গ্লানির কথা শুনে তারা দূরে সরে যায়। এক পর্যায়ে আমার বর্তমান স্বামী চাচাতো ভাই দুলাল মিয়ার সাথে আমার বিয়ে হয়। স্বামীকে প্রথম রাতেই বলেছিলাম, জীবনে যত দুঃখ কষ্ট দেবার দিও কিন্ত ৭১’র কথা বলে কখনো আমাকে খোটা দিও না। স্বামী আমার কথা রেখেছে। আমাদের দুই জনেরই এখন শেষ বয়স। বৃদ্ধ হয়ে গেছি। সারা জীবন অভাব অনটনের মধ্যে জীবন কাটিয়েছি। স্বামী যে দিন কাজ পায়নি সেদিন না খেয়ে থেকেছি। অভাবের জ্বালায় ঘরে দরজা বন্ধ করে কেঁদেছি কিন্ত আমার মত বীরাঙ্গনার কান্না কেউ শুনেনি। দেশ স্বাধীন হয়েছে ৪৪ বছর গত হলেও কোন সরকারের লোকেরা এসে বলেনি দেশের জন্য তুমি ইজ্জত হারিয়েছ। তোমার কোন অপরাধ ছিল না। আসো তোমার জন্য কিছু করি। কেউ করেনি।

এতগুলি বছর পর এবার (২০১৫ খ্রি.) কুমিল্লা জেলা প্রশাসক আমাদের ১৫ জনকে খুঁজে বের করে কুমিল্লা শহরে নিয়ে গিয়ে অনুষ্ঠান করে সম্মানিত করেছেন। আমাদের জন্য জায়গায় লিখে দিয়েছেন। কিন্ত এই জায়গায় এই মুহূর্তে কিছু করা যাচ্ছে না। কারণ, যে জমি লিখে দিয়েছে সেটা একটা জলাভুমি। সারা বছর পানি লেগে থাকে। এখন আছে বুক সমান পানি। তারপরও জেলা প্রশাসককে ধন্যবাদ জানাই তিনি যে আমাদের স্বীকৃতি দিয়েছেন।