প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর পাচ্ছে আরো ৬৫ হাজার পরিবার - Vikaspedia

প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর পাচ্ছে আরো ৬৫ হাজার পরিবার

৮০ বছরের বৃদ্ধ ছায়েদ আলীর পরিবারের সদস্য সংখ্যা ৬ জন। তিন ছেলে আর দুই মেয়ের বিয়ে দেওয়ার পর সংসারে শুধু স্বামী-স্ত্রী দুই জন।

থাকেন গোহাইলবাড়ী মান্নান কলেজের পাশে। সম্প্রতি এই দম্পতি ঘর পেয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের তৃতীয় পর্যায়ে।
বুধবার (৩০ মার্চ) গোহাইলবাড়ী আশ্রয়ণে দুপুরের খাঁ খাঁ রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে কথা হয় ছায়েদ আলীর স্ত্রী পান্নু বেগমের সঙ্গে।

খুশিতে আপ্লুত হয়ে কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, ‘আমরা স্বামী-স্ত্রী দুজনেই কামলা খাটি। মাসে ১৬০০ টাকা করে যে বাড়িতে ভাড়া থাকতাম, সেখানে ভাঙা ঘর, বৃষ্টি হলে পানি ওঠে। মাঝে মাঝে ভাড়া দিতে দেরি হলে ঘর থেকেও বের করে দিত। এখন প্রধানমন্ত্রী আমাকে ঘর দিয়েছে, তাও আবার পাকা ঘর। স্বপ্নেও কোনদিন ভাবি নাই যে, পান্নু বেগমের নামে ঘর হবে! বুড়া-বুড়ি নিজের ঘরের বারান্দায় বসে গল্প করবো। ’

কিছুদিন পরেই নিজের প্রথম সন্তানের জন্ম দেবেন নূরজাহান আক্তার। গার্মেন্টস কর্মী রকিবুল ইসলামের স্ত্রী নূরজাহান বলেন, ‘আমাদের গ্রামের বাড়ি ছিল কুড়িগ্রাম। নদী ভাঙনে ঘরবাড়ি সব হারিয়ে প্রায় ১৫ বছর আগে বাবা-মার সঙ্গে ঢাকা আসি। এরপর পরিবার নিয়ে কোনরকমে একটা ভাড়া বাড়িতে থাকি, গার্মেন্টসে কাজ করি। নিজের বলতে কিছুই নাই। তবে প্রধানমন্ত্রীর এই ঘর পাওয়ার পর এখন বাবু (সন্তান) আসলে বলতে পারবো, আমাদের একটা ঘর আছে। ’

আর মমিনুল ইসলাম নামের অপর আরেকজন বলেন, ‘আমি পেশায় কৃষক। এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে থাকি, সবাই জানে আমার অবস্থা। এরপর যখন শুনলাম যাদের ঘর নাই, প্রধানমন্ত্রী তাদের ঘর উপহার দেবে। তখন চেয়ারম্যানের কাছে জানাইছি। সে আমিসহ আরও যারা আছে, তাদের যাচাই-বাছায় করে তালিকা তৈরি করে ঘর দিছে। নদী ভাঙনে ২০ বছর আগে যে ঘর হারিয়েছি আজ যেন আবার ফিরে পেলাম। ’

শুধু ছায়েদ আলী, পান্নু বেগম, মমিনুল ইসলাম বা নূরজাহান আক্তার নয়, প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের আশ্রয়ণ প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ে ঘর বরাদ্দ পেয়েছেন মোট ৬৫ হাজার ৪৭৪টি পান্নু বেগমের মতো পরিবার। মুজিববর্ষে ভূমিহীন ও গৃহহীন অসহায় মানুষের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপহার হিসেবে তারা এ ঘর বরাদ্দ পাচ্ছেন।

নতুন ঘরগুলোর নির্মাণকাজও প্রায় শেষের পথে। নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর সুবিধাজনক সময়ে বিনামূল্যে দুই শতক জমিসহ সেমিপাকা এসব ঘর পরিবারগুলোর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে দেবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

সাভারের শিমুলিয়ার গোহাইলবাড়ীতে প্রকল্পস্থানে সব মিলিয়ে ৬৪টি পরিবারকে একক গৃহ দেওয়া হবে। যার অংশ হিসেবে লটারির মাধ্যমে নির্বাচিত ২৪টি পরিবারকে ঘর বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। শীঘ্রই আরও ৪০টি পরিবারকে ঘর বুঝিয়ে দেওয়া হবে বলে জানান শিমুলিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এবিএম আজহারুল ইসলাম সুরুজ।

তিনি বলেন, যে স্থানটিতে এ প্রকল্পের শেষ মুহূর্তের কাজ চলছে দীর্ঘদিন ধরেই জমিটি দখলে রেখেছিলেন স্থানীয় ভূমিদস্যুরা। গত বছর সরকারি খাসজমি উদ্ধার করে এ প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে।

এদিকে আগের দুই পর্যায়ের কাজের অভিজ্ঞতায় মুজিববর্ষের উপহারের এসব ঘরকে অধিকতর টেকসই করতে নকশায় আনা হয়েছে পরিবর্তন। জমি নির্বাচনের ক্ষেত্রেও নেওয়া হচ্ছে বিশেষ সতর্কতা। নতুন একক গৃহ নির্মাণের ব্যয়বরাদ্দও বেড়েছে।

তৃতীয় পর্যায়ে প্রতিটি ঘরের নির্মাণ খরচ ২ লাখ ৫৯ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। আগের দুই পর্যায়ে প্রতিটি ঘরের জন্য বরাদ্দ ছিল প্রথম পর্যায়ে এক লাখ ৭১ হাজার টাকা এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে ১ লাখ ৯৫ হাজার টাকা। তবে এসব ঘর নির্মাণকে ট্যাক্স ও ভ্যাটের আওতামুক্ত রাখার ফলে বাজারদরের চেয়ে সাশ্রয়ী মূল্যে ঘরগুলো নির্মাণ করা সম্ভব হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

রঙিন টিনশেডের প্রতিটি একক গৃহে ইটের দেয়াল, কংক্রিটের মেঝে এবং টিনের ছাউনি দিয়ে তৈরি দুটি করে শোয়ার ঘর, একটি রান্নাঘর, টয়লেট এবং সামনে খোলা বারান্দা রয়েছে।

আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক আবু ছালেহ মোহাম্মদ ফেরদৌস খান বাংলানিউজকে বলেন, একসঙ্গে এত মানুষকে বিনামূল্যে বাড়ি-ঘর দেওয়ার ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম ও সর্ববৃহৎ। বিশ্বে এটা নতুন মডেল, আগে কখনও কেউ যেটা ভাবেনি।

আশ্রয়ণ প্রকল্পে সেই কথাই যেন সকলের মুখে। তাইতো অন্যের বাড়িতে থাকার বদলে নিজের বাড়িতে থাকতে পারার আনন্দ স্পষ্ট দেখা গেলো সোনা মিয়ার অভিব্যক্তিতে। তিনি বললেন, অন্যের বাড়িতে থাকার অনেক সমস্যা। এখন নিজের বাড়িতে থাকবো, এটা সত্যিই আনন্দের। বছরের পর বছর মানুষের জমিতে কাজ করেছি। টাকার অভাবে পড়াশোনা করতে না পারায় আর কিছুই করতে পারিনি। এখন এ বুড়ো বয়সে নিজের ঘর বুঝে পেলাম এটাই আনন্দের।