৩০০ কোটি টাকা নিয়ে লাপাত্তা ! - Vikaspedia

৩০০ কোটি টাকা নিয়ে লাপাত্তা !

চেতনা মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেডের প্রতিষ্ঠা করে ঢাকার আশুলিয়া ও সাভারে ইন্ডাস্ট্রিজ এলাকার মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত সহস্রাধিক মানুষকে দ্বিগুণ মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারণার মাধ্যমে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় প্রতিষ্ঠানটি। ২০০৮ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত প্রতারণার মাধ্যমে গ্রাহকদের ওই টাকা আত্মসাৎ করে আসছে চেতনা মাল্টিপারপাস।

টার্গেট করা নিম্নআয়ের মানুষদের কোম্পানিতে সঞ্চয়ী পলিসি, এফডিআর, ডিপিএস, পেনশন পলিসি, শিক্ষা পলিসি, হজ পলিসি, রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী পার্টনার পলিসিতে আকৃষ্ট করত। এসব খাতে বিনিয়োগের ১৮-৩০ শতাংশ মুনাফার প্রলোভন দেখাতো। ৩/৫ বছরের ফিক্সডিপোজিটের ক্ষেত্রে ডাবল লাভের অফারও দিত৷ আবার প্রথম দিকে গ্রাহকদের বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের জন্য প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কয়েক কিস্তিতে মুনাফা দিতো প্রতিষ্ঠানটি। নিম্নআয়ের হাজারো মানুষ যখন দ্বিগুণ মুনাফার আশায় প্রতারক ওই প্রতিষ্ঠানের কাছে টাকা রাখছিল, ঠিক এ সময় পরিকল্পনা অনুযায়ী অফিস তালা দিয়ে লাপাত্তা হয়ে যায় চেতনার প্রতিষ্ঠানের সভাপতি মুহাম্মদউল্লাহসহ তার সহযোগীরা।

বুধবার (২৩ মার্চ) দুপুরে রাজধানীর কারওয়ানবাজারে র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানিয়েছেন র‌্যাব-৪ এর অধিনায়ক (সিও) অতিরিক্ত ডিআইজি মোজাম্মেল হক।

সম্প্রতি ভুক্তভোগীদের অভিযোগের ভিত্তিতে গত ২২ মার্চ থেকে ২৩ মার্চ পর্যন্ত ঢাকার আশুলিয়া ও সাভারে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করে চেতনার সহ সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদকসহ ১০ জনকে প্রতারণার দায়ে গ্রেফতার করে র‌্যাব-৪। প্রতারক চক্রের মূলহোতা ও প্রতিষ্ঠানের সভাপতি মুহাম্মদ উল্লাহ পালিয়ে যায়। গ্রেফতার প্রতারকরা হলেন- মো. ইকবাল হোসেন সরকার (৩৫), মাজহারুল ইসলাম (৩৫), মো. মমিন হোসেন (৩৫), মো. জাহাঙ্গীর আলম (৩৫), ইব্রাহিম খলিল (৩৫), এস এম মকবুল হোসেন (৪০), মিজানুর রহমান (৩৮), আল আমিন হোসেন (২৮), ফজলুল হক (৩৫) ও নুর হোসেন (২৭)। অভিযানে প্রতিষ্ঠানের সাভার জামগড়া এলাকার অফিস কার্যালয় থেকে থেকে প্রতারণায় ব্যবহৃত বিভিন্ন সামগ্রী জব্দ করা হয়। র‌্যাব জানায়, প্রতিষ্ঠানটির প্রতি বিশ্বাস করে ভুক্তভোগীদের অনেকে নিজের পেনশনের টাকা, গ্রামের ভিটেবাড়ি বিক্রি করা টাকা, বিদেশ থেকে কষ্ট করে অর্জিত অর্থ এই সংস্থায় উচ্চ মুনাফা লাভের আশায় জমা রেখেছিল। তাদের এই কষ্টার্জিত অর্থ হাতিয়ে পালিয়ে যায় প্রতারক চক্রটি।

র‌্যাব-৪ এর সিও অতিরিক্ত ডিআইজি মোজাম্মেল হক বলেন, ‘এ প্রতিষ্ঠানের অংশীদাররা বিভিন্ন জায়গায় নামে-বেনামে জায়গা-জমি কেনা, বহুতল ভবন নির্মাণ, বিভিন্ন ছোট-বড় কারখানা করেছে। একইসঙ্গে বিভিন্ন সময়ে নামে-বেনামে বিভিন্নভাবে অর্থ বিদেশে পাচার করেছে। প্রাথমিকভাবে জানা যায়, সহস্রাধিক পরিবারের প্রায় শতাধিক কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে এ চক্রটি।

ভুক্তভোগী গ্রাহকরা জানান, ইসলামী শরিয়াহ মোতাবেক উচ্চ মুনাফার আশা দেখিয়ে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সঞ্চয়ী প্রকল্প ইত্যাদি দেখিয়ে তাদের কাছে থেকে লাখে প্রতিমাসে টাকার পরিমাণ ও মেয়াদ অনুযায়ী ১ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা লভ্যাংশ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয়। প্রথমে ঠিকঠাক মতো লভ্যাংশ দিলেও এর কিছু দিন পর থেকে লভ্যাংশ তো দিচ্ছেই না বরং মেয়াদ পূর্ণ হলেও আসল টাকা দিতেই নানা তালবাহানা শুরু করেন। সর্বশেষ ভুক্তভোগীরা আসল টাকা ফেরত চাইলে শনিবার (২০ মার্চ) সকালে টাকা দেওয়ার কথা বলে গ্রাহকদের শতাধিক কোটি টাকা আত্মসাৎ করে লাপাত্তা হয়ে যায় ওই প্রতারক চক্রটি। এ বিষয়টি প্রথম সারির প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিকস মিডিয়াসহ স্থানীয়ভাবে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। এর ফলশ্রুতিতে এ প্রতারক চক্রের সদস্যদের আইনের আওতায় নিয়ে আসতে র‌্যাব-৪ গোয়েন্দা কার্যক্রম বাড়ায়।

গ্রেফতার অপর আসামিরা মো. মিজানুর রহমান ও নুর হোসেন এ সমিতির বেতনভুক্ত কর্মচারী হিসেবে এবছরের শুরুতে যোগদান করেন। ওই প্রতিষ্ঠানের প্রতারণার সঙ্গে বেশ কিছু ব্যক্তির নাম পাওয়া গেছে। যা তদন্তের মাধ্যমে তাদের পরিচয় এবং প্রতারণার ভূমিকা বেরিয়ে আসবে। সাভার উপজেলা সমবায় কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী গত জুনের সর্বশেষ অডিট অনুযায়ী এ সমিতির ফ্যান্ডে ৬১ লাখ টাকা জমা রয়েছে।

প্রতারণার কৌশল-সদস্য সংগ্রহ

এই প্রতারক চক্রের মাঠপর্যায়ের কর্মী/সদস্য রয়েছে। এরা ঢাকা জেলার আশুলিয়া, সাভার ও ধামরাই এলাকার মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষ যেমন-গার্মেন্টসকর্মী, রিকশাচালক, ভ্যানচালক, অটোচালক, সবজি ব্যবসায়ী, ফল ব্যবসায়ীসহ নিম্নআয়ের মানুষদের টার্গেট করে প্রতি লাখে ১ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা মাসিক লভ্যাংশ এবং স্বল্প সময়ে মাসিক মেয়াদ শেষে অধিক মুনাফা লাভের প্রলোভন দেখিয়ে তাদের কোম্পানিতে বিনিয়োগ করতে উদ্বুদ্ধ করতেন।

স্বল্প সময়ে অধিক মুনাফার প্রলোভন

আসামিরা ভুক্তভোগীদের বিভিন্নভাবে প্রলোভন দেখিয়ে স্বল্প সময়ে অধিক মুনাফা দেওয়ার নিশ্চয়তা দিয়ে চেতনা মাল্টিপারপাসে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী করতেন। এভাবে প্রলুব্ধ হয়ে ভুক্তভোগীরা ওই কোম্পানিতে বিনিয়োগ করতেন। ভুক্তভোগীদের বক্তব্য অনুযায়ী ১৮ শতাংশ থেকে ৩০ শতাংশ হারে মুনাফা এবং ফিক্সডিপোজিটের ক্ষেত্রে ৩/৫ বছরের ডাবল লাভ দেওয়ার আশ্বাস দিতেন।

বিভিন্ন ভুয়া প্রকল্প প্রচার

সাধারণ মানুষকে ভুল বুঝিয়ে বিভিন্ন ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে তাদের কাছে থেকে গাছের বাগান, ডেইরি ফার্ম, হজে পাঠানো, ফ্ল্যাট ও প্লট ইত্যাদির মাধ্যমে গ্রাহককে উচ্চ মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারণামূলকভাবে নগদ অর্থ হাতিয়ে নিয়ে আসছিল।

ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ

এ কোম্পানির কিছু সদস্য মাসিক/পাক্ষিকভিত্তিতে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে ডিপিএসের টাকা সংগ্রহ করতেন। ভুক্তভোগীদের বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখানো হতো। তারা যদি সময়মত ডিপিএসের টাকা না পরিশোধ করে তাহলে মেয়াদ শেষে তারা মুনাফা কম পাবেন এবং নিয়মিত টাকা না দিলে জরিমানাও করা হতো। অধিক মুনাফার লোভে ভুক্তভোগীরা সঠিক সময়ে ডিপিএসের টাকা জমা দিতেন। এমনকি করোনাকালীন সময়েও খেয়ে না খেয়ে কষ্ট করে সমিতিতে নিয়মিত টাকা দিয়েও পক্ষান্তরে কোন লভ্যাংশ পায়নি।

প্রতারণার কৌশল

ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের বিভ্রান্ত করার জন্য তারা ইসলামী শরিয়াহ মোতাবেক তাদের প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে মর্মে প্রচারণা চালাত যদিও তাদের কোন বিধি মোতাবেক ইসলামী শরিয়াহ বোর্ড ছিল না। এ প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব জায়গা সমিতির নামে রেজিস্ট্রেশনের কথা থাকলেও তা মূলত পলাতক সভাপতি মুহাম্মদউল্লাহ, তাজুল ইসলাম এবং অজ্ঞাতপরিচয় নামে রেজিস্ট্রেশন করা হয়েছিল।

তিনি আরও বলেন, এই সমিতি সমবায় অধিদপ্তর কর্তৃক রেজিস্ট্রিকৃত রয়েছে এবং শুধুমাত্র সমিতি সদস্যদের কাজ থেকে সমিতি পরিচালনার জন্য অনুমোদন রয়েছে। তাদের প্রতারণার কৌশল হিসেবে সৃষ্ট নাস্বস্থ চেতনা কল্যাণ পরিবার ট্রাস্ট, চেতনা গার্ডেনিয়া এ ধরনের প্রকল্পের কোন অনুমোদন নেই। কিন্তু চেতনা মাল্টিপারপাসের আর্থিক লেনদেন বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ও সঞ্চয় গ্রহণ বা ঋণদান মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরির অথরিটি কর্তৃক অনুমোদিত নয়।